বুক রিভিউ
বই: ইন্দুবালা ভাতের হোটেল
লেখক: কল্লোল লাহিড়ী
খুলনার কলাপোতা গ্রামের ইন্দুর বিয়ে হলো কলকাতায়। দোজবরে মাতাল এক পুরুষের সঙ্গে। তিন সন্তান নিয়ে অল্পকালেই বিধবা। তারপর পূর্ব পাকিস্তান যেদিন হলো বাংলাদেশ, সেদিনই ছেনু মিত্তির লেনে প্রথম আঁচ পড়লো ইন্দুবালা ভাতের হোটেলে। এই উপন্যাসে ছেনু মিত্তির লেন ছুঁয়ে থাকে এক টুকরো খুলনা ও রান্নাঘরের স্মৃতি রোমন্থনের গল্প।
গল্পটি ইন্দুবালার,তার জীবনের- খুবই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এক বাঙালী নারীর। আর তার জীবনের সব থেকে বড় সম্পদ "ইন্দুবালা ভাতের হোটেল" এর গল্প। যে হোটেলের প্রতিটি মেন্যুর সাথে কোনো না কোনো স্মৃতি আর গল্প মিশে আছে।
দেশ ভাঙার গল্প , দেশ ছাড়ার গল্প , ওপার থেকে এপারে আসার গল্প , একের পর এক স্বজন হারানোর গল্প , একটা মেয়ের মহিলা হবার গল্প , বাড়ির পেছনের বাগান আর নকশাল সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ, খুলনা ও একটুকরো কলকাতা মিলেমিশে একাকার।
উপন্যাসের নায়িকা ইন্দুবালার বালিকা বয়স থেকে জীবন সায়াহ্ন পর্যন্ত চিত্রিত করেছেন লেখক।
পূর্ব পাকিস্তানের খুলনার কলাপোতা গ্রামে বেড়ে ওঠা একটি মেয়ের বিয়ে হয় কলকাতার দোজবর পাত্রের সাথে।গ্রামে ঠাকুমা, বাবা,মা,ভাইয়ের সাথে কাটানো রঙিন দিনগুলোকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যায় কলকাতা শহরে।মাতাল স্বামী আর শ্বশুড়ির নিয়মকানুনের আষ্টেপৃষ্টে বাঁধতে হয় জীবনকে।এরপর মাছওয়ালী লছমীর পরামর্শে হোটেল শুরু করে শক্ত হাতে হাল ধরেন সংসারের।হোটেল চালিয়ে শিক্ষিত করেন সন্তানদের।ইন্দুবালা এমন এক নারী যিনি কখনো সন্তানদের চাকরির একটি টাকা নেননি।হোটেল চালিয়ে গেছেন জীবনের শেষ অবধি।যে হোটেলে রান্না হতো খুলনায় ঠাকুমার থেকে শেখা সব বাঙালিয়ানা রান্না(এসব রান্নায় সে খুজে ফিরত খুলনাকে)।এই হোটেলের মাধ্যমে ইন্দুবালা যে শুধু রোজগার করেছেন তা নয় করেছে মানবসেবা। খাইয়েছে গরিব, দুঃখী,মুক্তিযোদ্ধা, এবং আন্দোলনকারী ছাত্রদের,মিটিয়েছেন মেসের ছেলেমেয়েদের খাওয়ার আবদার।
কলকাতায় শিকড় গজিয়েছে ইন্দুবালার কিন্তু খুলনাকে ভুলতে পারে নি।সেই মুসলিম ছেলে মুনিরুলের প্রতি জন্ম নেয়া অব্যক্ত ভালোবাসা কে লালন করেছে নিরবে।দেশের জন্য তার ভিতরে ঝড় উঠেছে সহস্রবার।কোন ঝড়েই সে আর ভারত থেকে বাংলাদেশে আসতে পারে নি।বড় ছেলে পাসপোর্ট করা সত্ত্বেও সে আর আসে নি এপারে কারণ তার জন্য অপেক্ষমান কেউ ছিল না খুলনায় ৭১ এ পুড়ে গেছে সব।
খুলনা আর কলকাতার মধ্যে উঠা কাঁটা তারটা আজও অক্ষত।কতজনের পূর্বপুরুষ ই তো অপর পারের যাদের একটা মন কেমন করার গল্প থেকে যায়।যা কেবলই সুখ স্মৃতি, কে হায় বেদনা জাগাতে চায়?আর সব ছাপিয়ে স্মৃতিতে, স্বরণে সদা বিরাজমান মনিরুল, প্রথম প্রেম- ভালোবাসা অম্লান।
Comments
Post a Comment